সরিষাবাড়ীতে শহীদ বেলালের স্মৃতি বিলুপ্তির পায়তারায় পাকিস্তানের দোসররা

তাই স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন ঐ যুদ্ধে বেঁচে ফেরা তার সহযোদ্ধাগণ

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে তারাকান্দির কান্দারপাড়া নামক স্থানটিতে প্রয়াত রাষ্টদূত বীর মুক্তিযোদ্ধা (কোম্পানী কমান্ডার) ফজলুর রহমানের দিক নির্দেশনায় পাক-হানাদার বাহিনীকে প্রতিরুদ্ধকরণের আশান্বিত চিন্তায় এলাকার সাধারণ, নিরীহ মানুষ সমেত আমাদের মৃত্যু ঠেকাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্তরায় ২৭ সদস্যের একটি ইউনিট চারভাগে বিভক্ত হয়ে বসির ডাক্তারের বাড়ী, মাঝি বাড়ী, শফিউল্লাহ তরফদারের বাড়ীর পশ্চিমে এবং কান্দারপাড়া বাজার হতে সম্মুখ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। অতঃপর দীর্ঘসময় রক্তক্ষয়ী তথা তুমুল যুদ্ধ চলাকালীনে আমরা ৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ১১ জন পাক-হানাদার বাহিনীকে হতাহত করি।

আমাদের মধ্যে সেই সন্ধিঃক্ষণে আমি বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল মান্নান ও আমার আরও দুই সহযোদ্ধা ( বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আমজাদ হোসেন, শহীদ বেলাল হোসেন) পাক-হানাদার বাহিনী কর্তৃক ব্রাশ ফায়ারে গুরুতর আহত হই ও আমার (বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল মান্নান) ডান হাত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলালকে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে থাকা পাকিস্থানির এক দোষরের তথ্যালোকে উঠিয়ে নেয়ার পর নির্মমভাবে হত্যা করে। বেলালের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পাক হানাদার বাহিনী চলে যায়, অতঃপর ডিঙ্গি নৌকা যোগে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ পাটখড়ির মধ্যে আচ্ছাদিত করে ডাঃ ফজলুর রহমান আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে লাশটি পৌঁছে দেয় তার নিজ গ্রামে (গোবিন্দপটল)।

তার ( শহীদ বেলাল) ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে বেঁচে ফেরা সহযোদ্ধা সমেত মুক্তিযোদ্ধা বেলালের মা-বাবা, আত্মীয় স্বজনদের আকাশ বিদারি কান্নার আহাজারিতে মর্মস্পর্শী ও আবেগ আপ্লুত হয় এলাকাবাসী। অতঃপর সেই অনুযায়ী তৎকালীন কান্দারপাড়া গ্রামটির নামকরণ করা হয় বেলাল নগরী। ৭১ ‘রে স্বাধীনতা যুদ্ধে কান্দারপাড়া গ্রামে দেহের ওজন সমান রক্তক্ষরণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলালের আত্মত্যাগের হেতু শহীদ মিনারের ফলক উন্মোচনের মধ্যেদিয়ে সৃষ্ট আজ এই বেলাল নগরী। সেই বেলাল নগরী আজ বিলুপ্ত করার পাইতরায় রয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানির দোষররা। এমন এক প্রক্রিয়া করণে বেলাল নগরী বিলুপ্ত করার পায়-তারায় তারা লিপ্ত আছে বলতে গেলে আমরা বাকরুদ্ধ হই। কারণ আমরা (মুক্তিযোদ্ধা) স্বাধীনতার চেতনায় বাঙ্গালি মুসলিম। তাই ইশ্বরের উপাসনালয়কে অবজ্ঞা করা অসম্ভব বলে মনে করছি। আল্লাহর ঘর মসজিদের স্থান দিয়ে ঘেড়াও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলালের স্মৃতি চারণে থাকা শহীদ মিনারটি পশ্চিমে থাকা রেলওয়ে জমির মধ্যে মজা পুকুরটি ভরাট করে স্থায়ীকরণে যেন সু-আজ্ঞা হয় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীর।

এ বিষয়ে বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল মান্নান আরও বলেন, ‘এখন আর কেউ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যান না। আজ শহীদ মিনারের সেই দেয়ালটি ভেঙ্গে ছোট্ট বেসের উপর সরু তিনটি পিলার করা হয়েছে, যা দূর থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। দেখা যায়, শহীদ মিনারটি থেকে মাত্র ৪/৫ ফুট পূর্ব পাশে বড় একটি পাঁকা মসজিদ করা হয়েছে, উত্তর পাশে মসজিদ সাথেই পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা করে হাফিজিয়া মাদ্রাসাঘর ও দক্ষিণ পাশে কয়েকটি টয়লেট করা হয়েছে। পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে মজা পুকুর কাটা হয়েছে। শহীদ মিনারের একদম পশ্চিম পাশ ঘেঁষে মাটি কাটা হয়েছে। অর্থাৎ সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পশ্চিম দিকে হেলে পড়ে মজা পুকুরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আমাদের স্মৃতির মিনার, আমাদের রক্তের মিনার। পূর্ব দিক থেকে শহীদ মিনারে যাবার জন্য সরু একটি রাস্তা রাখা হয়েছে, যে রাস্তা দিয়ে দু’জন পাশাপাশি যাওয়া যায় না। এর চেয়ে আরও বড় ষড়যন্ত্র হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সংরক্ষিত দলিলপত্রে। সেখানে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধ/ প্রতিরোধ যুদ্ধের স্থলে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, বদ্ধভূমি অর্থাৎ এখানে কোন যুদ্ধই হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে আমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের সন্মানিত প্রতিনিধির আলোচনায় বেরিয়ে আসে, একটি স্মৃতিস্মারক এবং ছোট্ট হলেও একটি শহীদ বেলাল স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ। কেননা স্থায়ীভাবে কোন স্থাপনা নির্মাণ ব্যাতিত মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস রক্ষা করা সম্ভব হবে না । তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট প্রকল্পদ্বয় জরুরী ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ও ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবেন এবং আমাদের দেখে যাবার সুযোগ করে দিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'