অপেক্ষা ছিলো শেখ মুজিব’কে একনজর দেখারঃ ডাঃ মুরাদ হাসান

৭০’র গণ পরিষদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান আসছেন জামালপুরে। জনসভা হবে জামালপুর স্টেডিয়াম। খবরটি আমি আগেই শুনেছিলাম বাবার মুখে। সেদিন বাবা বের হবার আগেই আমি বন্ধুদের সাথে চলে গিয়েছিলাম স্টেডিয়ামে। শত শত মানুষের মাঝে আমিও অপেক্ষা করেছিলাম শেখ মুজিবকে এক নজর দেখার জন্য। অতঃপর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নেতা উঠলেন জনতার মঞ্চে। তৎমঞ্চে উঠে বিশাল দেহের সেই কাঙ্খিত সু-পুরুষ জনতার উদ্দেশ্যে।

সমস্বরে চিৎকার করে উঠে নেতার সম্ভাষণের জবাব দিলেন উপস্থিত জনতা। সেদিনই আমি প্রথম দেখি শেখ মুজিবকে। ঐদিনের জনসভায় অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে বাবাও ছিলেন শেখ মুজিবের পাশে বসা। শুক্রবার, জামালপুরে বঙ্গবন্ধুর সাথে বাবার অস্পষ্ট স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উপরের কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য,জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি, জামালপুর আইন মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, মহান মুক্তিযুদ্ধে জামালপুর শেরপুর মহকুমার প্রধান সংগঠক,সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, জামালপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি,বীর মুক্তিযোদ্ধা, এডভোকেট মতিউর রহমান তালুকদার এর সুযোগ্য পুত্র ও জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, বর্তমান তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মুরাদ হাসান এর বড় ভাই বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি মোঃ মাহমুদ হাসান তালুকদার।

○জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক কৌশল, সাংগঠনিক প্রয়োজন ও নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় বেশ কয়েকবার জামালপুর এসেছেন। থেকেছেন, খেয়েছেন, ঘুরে বেরিয়েছেন। মিশেছেন জামালপুরের মাটি ও মানুষের সাথে। জামালপুরের নেতৃবৃন্দের সাথে ছিল তার আত্মিক সম্পর্ক। সেসময় জামালপুরে আওয়ামী রাজনীতিতে যারা বঙ্গবন্ধুর আস্থা,বিশ্বাস ও নির্ভরতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর কাছে থেকে রাজনৈতিক দীক্ষা নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল যাদের, এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। যিনি আওয়ামীলীগের ঊষা লগ্নে থেকে শুরু করে চরম দুঃসময়ে জামালপুর আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন বা কান্ডারি ছিলেন। যৌবন ও জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ও আগলে রাখতে ব্যয় করেছে। আমৃত্যু তিনি তাঁর দল ও দেশপ্রেমের আদর্শকে সমুন্নত রেখেছেন।।

○১৯৩৪ সালের ১লা নভেম্বর জামালপুর মহকুমার সরিষাবাড়ী থানাধীন দৌলতপুর গ্রামের এক মুসলিম সম্রান্ত পরিবারে পিতা আব্দুল ওয়াদুদ তালুকদার ও মাতা হালিমা খাতুনের ঘরে জন্ম নেন। নিজ গন্ডি সীমায় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনী করে ১৯৫৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাঁর আওয়ামী রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬২ সালে যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্বাধিকার আন্দোলন চলছিল সেই আন্দোলনে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন। তখন থেকে তাঁর নেতা শেখ মুজিবের সাথে পরিচয়।

○১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে তিনি গণআন্দোলনে জামালপুর মহকুমা ও শেরপুর থানার নেতৃত্ব দেন। ৭০ এর গণপরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগ মনোনীত জামালপুরের প্রার্থীদের হয়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের পায়ে হেটে নৌকার ভোট প্রার্থনা করেন।
সে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ডাক আসে ৭ই মার্চের। কালজয়ী সে ভাষণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। সর্বদলীয় সে সংগ্রাম পরিষদের জামালপুর মহকুমা ও শেরপুর থানার আহবায়ক এর দায়িত্ব পালন করেন মতিয়র রহমান। ২৫ মার্চ কালো রাত্রির পর দেশ মাতৃকার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পরিবার-পরিজন ফেলে তিনি চলে যান ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে। সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে মহেন্দ্রগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন এছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকার স্থাপিত বিচার বিভাগের বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন।৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা উত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুর্ণগঠনে তিনি ছিলেন অগ্রসেনা। মতিয়র রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দেশাত্মবোধে মুগ্ধ হয়ে জাতির জনক ৭৫ সালে তাকে বাকশাল জামালপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত করেন। এরপর সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে দুর্যোগের ঘনঘটা।ক্ষমতালোভী মীরজাফরের হাতে স্বপরিবারে শহীদ হন জাতির জনক। সমরাস্ত্রের জুড়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসনে বিশ্বাসঘাতকরা এখানেই তারা ক্ষান্ত থাকেননি।মুজিব প্রেমিকদের খুঁজে খুঁজে ধরে ধরে নিজেদের মতে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। যারা লোভ লালসা ও মৃত্যুর মুখে তাদের সাথে দলের সাথে বেঈমানি করেননি তাদের কাউকে মেরে ফেলেছে,কাউকে জেলে ভরে দিয়েছে। আবার কাউকে দেশান্তর হতে বাধ্য করেছে।সেই তালিকায় ছিলেন মতিউর রহমানও। মুজিব আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করায় তাকেও কারাবরণ করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের সেই দুঃসময়ে তিনি জীবনের মায়ায় আত্মগোপন করেননি। বরং পায়ে হেঁটে, সাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন। সাহস যুগিয়েছেন ভীতসন্ত্রস্ত নেতাকর্মীদের। প্রতিবাদ, প্রতিরোধে নিজে সামনে সারিতে থেকে জানান দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না।

○আওয়ামী লীগ ছিল, আছে, থাকবে। সেই ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্বে থেকে দলকে আগলে রেখেছেন। এই সময়ের মধ্যে ক্ষমতার পালা বদলে আসা সরকারের প্রতিনিধিরা তাকে নিজেদের দলে ভীড়াতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেনি।তিনি নীতি ও মুজিব আদর্শে ছিলেন অটুট।মুজিব প্রেমে সব হারিয়ে থেকেছেন তৃপ্ত। রাজনীতি অঙ্গন ছাড়াও সামাজিক সংগঠনেও ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন,সরিষাবাড়ী কল্যাণ ও অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতি। জামালপুর মহকুমা রেডক্রিসেন্টের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘদিন।

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'