মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও জীবন

মধ্যবিত্ত বলতে আমরা কি বুঝি? মধ্যবিত্ত একটি শব্দমাত্র কিন্তু এই ছোট্ট একটি শব্দটি এতোটাই অর্থবহুল যার অর্থ একটা অভিধানের ভিতর প্রকাশ করা সম্ভব নয়।ছোট করে বলতে গেলে মধ্যবিত্ত বলতে এমন একটা জীবনকে বোঝায় যেখানে স্বাদ আছে কিন্তু সাধ্য থাকে না। যে জীবনের সহ্যক্ষমতা অনেক। বাসে কোথাও গেলে স্টুডেন্ট ভাড়া দেয়। রিকশাতে শেষ কবে চড়েছে মনে থাকে না তাঁদের। কখনও কখনও ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে চলে যায় ক্লান্তিহীনভাবে, যেন সে চলে যায় রুপকথার সিনবাদের যাদুর গালিচা করে। কারন তাঁরা মধ্যবিত্তের সন্তান। তবুও তাঁরা গর্বিত যে তাঁরা মধ্যবিত্ত।

তাঁদের কাড়িকাড়ি টাকা নেই উড়ানোর মতো।তাঁরা পকেটভর্তি টাকা নয়,মাথাভর্তি টেনশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।তাঁদের টাকা না থাকলেও আছে নিজের পরিবারের একটু হাসি দেখার মত ক্ষমতা। তাঁদের আছে পকেটে ১০ হাজার টাকা রেখে রাস্তার পাশের সস্তা টংয়ে বসে ডার্বির ধোয়া উড়ানোর মত সাহস। তাঁদের আছে মানিব্যাগে দুই টাকার নোট নিয়ে ফরমাল ড্রেস পরে কয়েক কিলো হাঁটার সাহস। তাঁদের বডিতে তিনশ টাকার পাঞ্জাবীটা দিব্বি মানিয়ে যায়। আবার সেই পাঞ্জাবী দুই বছর এমনিতেই চলে যায়।

মধ্যবিত্ত পরিবার !এরা না গরীবনা ধনী ।এই শ্রেণীর লোকেরা পৃথিবীতে আসে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জন্য !!মধ্যবিত্ত পরিবারে মানুষ স্বপ্ন দেখে না বা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় !কারন স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট খুবই মারাত্মক । তাঁদের জীবনটা হল ঘরপোড়া গরুর মত খুব অল্পতেই ভয় পায় । তাঁরা ইচ্ছা থাকলেই কোন কিছু করতে পারে না।তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপে পা ফেলতে হয় চিন্তা ভাবনা করে ! তাঁরা চাইলেও আর দশ জনের মত জীবনটা কাটাতে পারে না। কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁদের নিয়তি ঠিক করা থাকে,পড়ালেখা করে তাঁদের কিছু করতে হবে !তাঁদের সংসারের হাল ধরতে হবে।

মধ্যবিত্তদের একটা গুণ আছে সেটি হচ্ছে নিজেদের কষ্টগুলোকে চাপিয়ে রাখা।এরা লেখাপড়াতেও মধ্যবিত্ত। কষ্ট করে, প্রাইভেট না পড়ে,টিউশনি করে স্কুল,কলেজের গন্ডি পার করলেও ঠেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যবিত্তদের জীবনের কাহিনিগুলো নিয়ে মহাকাব্য লিখতে বসলে, কতগুলো ট্রাজিক মহাকাব্য লেখা যাবে তাঁর অন্ত নাই।

এদের টাকা আসে বাড়ি থেকে গুনে গুনে। মাসে ত্রিশ দিন,ত্রিশ দিনে নব্বইটা মিল। মিল গুনে গুনে টাকা পাঠায়।অবশ্য তাঁদের বাবা মায়ের ইচ্ছা থাকে বেশি দিবে কিন্তু উপায় থাকে না।এই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা সকালে খায় না।কেনণা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে একটা মিলের টাকা চলে যায়।তাঁরা সকাল দুপুরের খাবার একসাথে খায়,এই খাবারটির নাম ও তাঁরা ভালবেসে দিয়েছে (Breaklunch=Breakfast + Lunch)। থাকা খরচ বাঁচাতে এরা এসে ওঠে হলের গণরুমে।

চারজনের রুমে চব্বিশ জন। এদের থাকার কোন অসুবিধা হয় না কারণ এরা সবাই মধ্যবিত্ত । বাড়িতে বলে তাঁরা অনেক ভাল আছে,গর্ব করে বলে সরকারি রুমে থাকে খরচ লাগে না। বছরের শুরুতে তাঁরা প্লান করে ভ্রমণে যাবে,প্লান শেষে যখন বাড়িতে টাকা চায় তখন বাবা বলে ভ্রমণে যাস না। ভ্রমণের গাড়িতে শুধু দূর্ঘটনা ঘটে,বলেই বাবা ফোনটা কেটে দেই,ফোনের এ পাশ থেকে তাঁদের সন্তানেরা বুঝতে পারে ব্যাপারটা। বুঝতে পারে বাবা দূর্ঘটনাটা বলতে অর্থসংকটের কথা বোঝাচ্ছে।

পরে বাবার মন খারাপের কথা ভেবে সন্তান,বাবাকে ফোন দিয়ে জানাই, ” বাবা আমিও ভেবে দেখলাম ভ্রমণের গাড়িতেই বেশি দূর্ঘটনা ঘটে তাই ভাবছি যাব না। সন্তানের এতোটা সহজে বাবার কথাটা বুঝে ফেলার ব্যাপারটা বাবাও উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু কোন উপায় থাকে না কিছু করবার।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমদিন থেকেই বাবা- মা দিন গোনে আর কতদিন পর তাঁর সন্তান চাকরি করবে। একটা বছর যেতেই বলে, ” তুইতো আর তিন বছর পর চাকরি করবি” স্বপ্ন দেখে বাবা- মা তাঁর সন্তান এটা হবে। তাঁদের সন্তান কি চাকরি করবে সেটাও ঠিক করে দেয় তাঁদের বাবা- মা।মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা তাঁদের বাবা মায়ের স্বপ্নটাকেই নিজের স্বপ্ন করে জীবন যুদ্ধে ঝাপ দেয়।

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'