সফল অভিভাবক সফল রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল মালেক

শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে আব্দুল মালেকের অবদান অনস্বীকার্য

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ বিধস্ত বাংলাদেশ পূনর্গঠনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে আব্দুল মালেকের অবদান অনস্বীকার্য। মানবতার এই মহান নেতা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণের উজ্জল লক্ষত্র। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনার আনুগত্য ও বিশস্থ থেকে দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতায় ১৯৬৮ হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৬ বছর সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে নিষ্ঠার সাথে দলকে লালন পালন করে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন। দলীয় রাজনীতি করলেও তার উদার চিন্তা-চেতনা বহুগুণে গুনান্বিত সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে দলমত নির্বশেষে সকল শ্রেনির মানুষে কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অপরিসীম। তার রাজনীতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিটি স্রোততধারাকে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করার ব্রত নিয়ে আমৃত্যু সত্য, সুন্দরের পথে থেকে আলো ছড়িয়ে গেছেন। সেই সাথে সামাজিক ধর্মীয় ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন।

মরহুম আব্দুল মালেকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে জানা যায়। ১৯৩৪ সালে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার কামরাবাদ ইউনিয়নের বড়বাড়ীয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মোঃ ইসমাইল হোসেন মন্ডল, মাতার নাম ফুলজান বেওয়া। চারভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। বিনজাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ছাত্র জীবনে মেধাবী ছাত্র হিসেবে ১৯৫২ সালে সরিষাবাড়ী আর.ডি.এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন এবং আশেক মাহমুদ কলেজে অধ্যায়ন শুরু করেন। কিন্তু সাংসারিক দূর্বিপাকে ছাত্রজীবন শেষ করার আগেই ১৯৫৩ সালে পাট ব্যবসা দিয়ে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। সে পাট ব্যবসার জন্য নারায়নগঞ্জের পরেই ছিল সেকেন্ড ডান্ডি হিসেবে পরিচিত সরিষাবাড়ীর অবস্থান। কঠোর পরিশ্রম, সততা আর কর্মদক্ষতা এবং বিচক্ষণতায় ব্যবসায়ীক সংগ্রামে প্রতিটি সিঁড়ি পেরিয়ে নিজেকে একজন অনুকরণীয় সফল ব্যবসায়ী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মরহুম আঃ মালেক ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের উভয় অংশে মৌলিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনে কামরাবাদ ইউনিয়নে কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রথম ভোট যুদ্ধে জয়যুক্ত হন। এই সময় হইতে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ শুরু করেন। তথা সরিষাবাড়ী আর.ডি.এম. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও সরিষাবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের ডোনার সদস্য হন এবং সরিষাবাড়ী কলেজ ও সরিষাবাড়ী স্পোর্ট এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে এই সকল প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হন।

কৈশোর বয়স থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তাঁর জীবনের অন্যতম আদর্শ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুুক্তি সনদ ৬ দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে পুর্নগঠনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে কখনও পায়ে হেঁটে আবার কখনও বাই সাইকেলে করে সরিষাবাড়ীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশকে পরাধীনমুক্ত করার প্রত্যয়ে দল গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নীতি ও আদর্শের সাথে তিনি ছিলেন আপোষহীন। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সানিধ্য লাভ করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থেকে জাতীয় চার নেতার সার্বিক সহযোগিতায় অল্প সময়ের তিনি দক্ষ সংগঠক হিসেবে কর্মীবান্ধব নেতায় পরিণত হন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে আয়ুব খানের পতন এবং ইয়াহিয়া খানে মার্শাল‘ল’ এর মধ্য দিয়েই ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনিত হন এবং নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য (এম.এন.এ) নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকে সরিষাবাড়ীর মানুষ তাঁকে অতি আপন করে নিয়েছিল।

পরবর্তীতে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনের রায়কে বানচালের উদ্দেশ্যে নানারকম ষড়যন্ত্র, সামরিক শক্তি প্রয়োগে নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন শুরু করে। বিপরীতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। নির্বাচিত এল.এন.এ. হিসেবে আব্দুল মালেক দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ বাস্তবায়নের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। দেশকে স্বাধীন ও বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে গঠিত হলো মুজিবনগর সরকার। তিনি মুজিবনগর সরকারের যুদ্ধ পরিচালনা কমিটির অর্থ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি শপথ নিলেন দেশকে স্বাধীন করার। তিনি সকল তরুণ শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, ছাত্র, যুবকসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে আহŸান জানান। অভূতপূর্ব সাড়া মিলল। যারা রাজনীতি বুঝে না, ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ কখনও করেনি। শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে নেতা মানে, তাদের সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর কার্যকরী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য থানা তুলনায় সরিষাবাড়ী থানার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও বেশি ছিল। তিনি সকলকে ভারতে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি ১৯ মে ১৯৭০ সালে ভারত গিয়ে মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে সাক্ষাত করেন। মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে ঢালু, তোরাগ পাহার, মানকের চর, মহেন্দ্রগঞ্জের সমন্বয়ে কানাই পাড়া (মহেন্দ্রগঞ্জ) যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ইয়ুথ ক্যাম্প) গঠন করেন। পরবর্তীতে ঐক্যাম্প পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

তিনি সব সময় মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্র, বস্ত্র, অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতেন। ১১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী রাতভর পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ফলশ্রæতিতে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে পাকসেনারা পরদিন ১২ ডিসেম্বর ভোরে আত্মসমর্পণ করে। ঐদিনই (এমএনএ) আব্দুল মালেক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে ঐতিহাসিক গণময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সরিষাবাড়ী থানা হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় তাঁর অবদান সদা সমুজ্জল।

১৯৭২ সালে তিনি গণপরিষদ সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। স্বল্প সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হলো। ইতিহাসের সাক্ষী হলেন প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষরদাতা হিসেবে। যতদিন দেশ থাকবে ততদিন সরিষাবাড়ী বাসী তাঁকে সংবিধানের স্বাক্ষরদাতা হিসেবে হৃদয়ে চির জাগ্রত রাখবেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নির্দেশে সরিষাবাড়ী সকল সূধী সমাজকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সরিষাবাড়ী পূর্ণগঠনে তাঁর ভমিকার অনস্বীকার্য। তিনি একজন সৎ ও ন্যায়, নিষ্ঠ, ত্যাগী, পরীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর অনুগত দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে দ্বিতীবারের মতো নৌকা প্রতীকে মনোনীত হন। সেই সাথে জামালপুর সদর আসন নির্বাচনের দেখভালের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। এইবারও তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। দ্বিতীয়বারের মত এম.পি. নির্বাচিত হয়ে পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদের স্থায়ী কমিটির এবং ৩ সদস্য বিশিষ্ট জোট বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই জুট বোর্ড যুগান্তকারী পাটনীতি প্রণয়ন করে শ্রমিক, মালিক ও সকল পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। সেই সময় বিশে^ বাংলাদেশের পাটশিল্প ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করে। বৈদেশিক অর্থ অর্জনের এক নম্বরে ছিল পাটশিল্প।

বঙ্গবন্ধুর মতো দেশপ্রেম ও আদর্শের পাশাপাশি তার চেহারাও ছিল বঙ্গবন্ধুর মতো অবয়ব চেহারা। নামের অক্ষরে মিল, যেমন- মুজিবুর রহমানের ‘ম’, মালেক এর ‘ম’ অক্ষর অনুযায়ী সংসদে পাশাপাশি বসার সুযোগ হয়েছিল। যার ফলে মনের ও আত্মার মিল হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে ¯েœহ করে মালেক বলে ডাকতেন। রাজনৈতিক ও দলীয় প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু যতবার জামালপুর এসেছেন ততবার-ই তিনি থেকেছেন তার পাশে পাশে। সরিষাবাড়ীর রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোকিত নাম আব্দুল মালেক অত্যন্ত সংবেদনশীল নিবেদিত সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ রাজনীতিবিদ মানুষ ছিলেন।

মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে সরিষাবাড়ীর প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নানামুখী সৃজনশীল উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের দ্বারা শান্তির নীড় সরিষাবাড়ী গড়ার জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন। যেমন পিংনা সুজাত আলী কলেজ, আরামনগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (সালেমা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়), বগাড়পাড় উচ্চ বিদ্যালয়, রুদ্র বয়ড়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৩ সালে তার দুই একর নিজস্ব জমি দান করে সরিষাবাড়ী হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাথে পিংনার নরপাড়া হতে সরিষাবাড়ী ঝালুপাড়া ঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেন যা সেসময় যমুনা নদী ভাঙনের হাত থেকে বিভিন্ন এলাকা রক্ষা করে এবং দিগপাইত হতে ভূয়াপুর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন। যা যুদ্ধ বিধস্ত দেশে এধরনের বড় প্রকল্প অনেকটা অকল্পনীয় ছিল। কেবল সম্ভব হয়েছিল তার সৎ ইচ্ছা, ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে।

৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে নিহত হলে জাতীয় জীবনে নেমে এলো ঘোর অমানিশার শোক সাগর। তিনি মেনে নিতে পারলেন না জাতির পিতার নির্মম হত্যাকান্ড। খুনি মোস্তাক সরকারের রক্ত চক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে সংসদ থেকে ফিরে আসলেন সরিষাবাড়ীতে। জামালপুর জেলাকে আবার সংগঠিক করার দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে আব্দুল মালেক অচিরেই শোককে শক্তিতে পরিণত করেন। ৭৫’র ৬ নভেম্বর আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে জাতীয় চার নেতার গায়েবানা জানাযা সরিষাবাড়ীর গণময়দানে অনুষ্ঠিত হয়।

৭৫’র এর পরবর্তী রাজনীতিতে কেবল সরিষাবাড়ী নয়, সমগ্র জামালপুর জেলায় আওয়ামী লীগকে সংঘঠিত করতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাড় করাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আব্দুল মালেক সাহসিকতার দিক থেকে তিনি ছিলেন সিংহ পুরুষ। যে কোন বিপদে দলীয় নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসীদেরকে অসহায় রেখে গা ঢাকা দিতেন না। কোন নেতাকর্মীর শরীরে একটা আচড় লাগতে দিতেন না। তার এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি সরিষাবাড়ীর গণমানুষের অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জিয়াউর রহমান ময়মসিংহ সার্কিট হাউজে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আঃ মালেক সাহেবকে ডেকে নিয়ে যান এবং জাগদল (পরবর্তীতে বিএনপি) যোগদানের জন্য চাপ প্রয়োগ, হুমকি, মৃত্যুর ভয় দেখান। সেই সাথে মন্ত্রী বানানোর প্রস্তাব দেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পরীক্ষিত সৈনিক আব্দুল মালেক সাহসীকতার সাথে জীবন মৃত্যুর পরোয়ার না করে জিয়ার প্রস্তাব নাকোচ করেন।
বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শে অনড় আব্দুল মালেক ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। সরিষাবাড়ীর মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা থাকলেও জিয়াউর রহমানের প্রহসন নির্বাচনে বাংলাদেশের ন্যায় সরিষাবাড়ীতেও পরাজিত হন। ১৯৮১ সালে জাতীয় কাউন্সিলের আগে কে হবেন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দলটির সভাপতি তা নিয়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক গ্রুপিং, লবিং, কোন্দল, বঙ্গবন্ধুর অনুগত আব্দুল মালেকের মতো অনেক নেতা বঙ্গবন্ধুর দলকে বাঁচাতে বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি করার জন্য অনুরোধ করা হল। দলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে অনেক অনুরোধের পর রাজী হন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের দায়িত্ব নিলে তাঁকে জুগিয়েছেন সাহস, দিয়েছেন অনুপ্রেরণা এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর অনুগত থেকে কাজ করে গেছেন।

বাদ যায়নি জেনারেল এরশাদ সরকারও। তাঁর সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী, এমপিরা এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল মালেক নেতার বাড়ীতে। দেখিয়েছেন গাড়ী বাড়ি ক্ষমতার লোভ। কিন্তু তিনি চিরকাল নিজের সিদ্ধান্ত অটল থেকেছেন ।

অতঃপর ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি দল ক্ষমতায় এসে সারা দেশের ন্যায় সরিষাবাড়ী আওয়ামী লীগের উপর অত্যাচারের স্ট্রীম রোলার চালিয়েছেন। ওই সময়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক মাত্রায় অত্যাচার করা হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে বাড়ী ঘর থেকে। টিকতে না পেয়ে অনেক নেতাকর্মী অন্যত্র চলে গেছেন। চরম সেই দুঃসময়ে আব্দুল মালেক সরিষাবাড়ী আওয়ামী লীগকে আগলে রেখেছেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন। যেখানেই অত্যাচার নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তিনি সেখানেই ছুটে গেছেন। ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন নির্যাতিতদের পক্ষে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি কখনও পিছপা হননি। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে আমরণ সংগ্রামী এই সিংহপুরুষ ২০০৯ সালে শেষবারের মতো সরিষাবাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে সরিষাবাড়ী হাফেজিয়া মাদ্রাসা, আলহেরা ইসলামী একাডেমী, বড়বাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখা সত্তে¡ও নিজের নামে কোন প্রতিষ্ঠান করেননি। ধর্ম পরায়ণ আব্দুল মালেক শেষকালে এসে এলাকাবাসীর ইচ্ছায় নিজ গ্রামে আব্দুল মালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চারটি জনসভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন, শ্রদ্ধার পাত্র, মুজিব ও আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী, আজীবন সংগ্রামী, অকোতভয় বীর, গণমানুষের নেতা, সফল রাজনৈতিক ও সফল ব্যক্তিত্ব আলহাজ¦ আব্দুল মালেক ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারী প্রিয়জন, প্রিয় দেশ ও প্রিয় দলকে ছেড়ে প্রিয় নেতা স্মরণে চলে গেছেন। তাঁর চলে যাওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ তাদের অভিভাবক হারিয়েছে। যার শূণ্যতা কখনও পূরণ হবার নয় বলে মনে করছেন সরিষাবাড়ীর গণমানুষ।

সফল অভিভাবক
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল মালেক ছিলেন একজন সফল পিতা। তার অন্তরাত্মাজুড়ে ছিল প্রচন্ড শিক্ষানুরাগ। তাঁর স্ত্রীর নাম মালেকা বেগম। তিনিও একজন বিদূষী, ধর্ম পরায়ন, সহজ-সরল ও দরদী মহিলা। গরীব দুঃখী মানুষের সেবাই যার ব্রত। তিনি এলাকার রতœাগর্ভা হিসেবে পরিচিত। মরহুম আব্দুল মালেকের ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানদের পড়ালেখা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ তৈরিতে তিনি সফলতার পরিচয় দিয়ে গেছেন।

একজন সফল পিতা হিসেবে নিচে তার সন্তানদের পরিচয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ-

মেয়ে-১: ডাঃ রোকসানা আজিম, সাবেক সিভিল সার্জন, বাংলাদেশ সচিবালয়।

ছেলে-১: আঃ রাজ্জাক, পরিচালক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জামালপুর।

বিএসসি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বুয়েট, এম.বি.এ, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী
কমিশন।

ছেলে-২: ডাঃ মাহফুজুর রহমান, এমআরসিপি, senior consultan, Ennis hospital, আয়ারল্যান্ড।

মেয়ে-২: ডাঃ মাহমুদা নাসরিন, এম.বি.বি.এস (রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক

মেয়ে-৩: ডাঃ মমতাজ পারভীন, এম.আর.সি.পি, আয়ারল্যান্ড,senior consultant, Dalk hospital, আয়ারল্যান্ড।

ছেলে-৩ : মাহবুবুর রহমান হেলাল, কো-চেয়ারম্যান, এনার্জি এইড লিঃ, বাংলাদেশ। সাবেক পানিসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ। সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সরিষাবাড়ী উপজেলা শাখা।

ছেলে-৪: মহিতুল ইসলাম (জাতীয় শিশু কিশোর প্রতিযোগিতায় বিতর্কে ২য় স্থান অধিকারী, ১৯৮১ইং)

ছেলে-৫: ইউং কমান্ডার মাকসুদুল আলম, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বিএসসি এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মাস্টার্স,মিলিটারি সাইন্স, মাস্টার্স, মিলিটারি আর্টস। যুক্তরাষ্ট ফ্লাইট সেফটি কোর্সে বেস্ট অফিসার নির্বাচিত হওয়ায় আমেরিকান অনারি নাগরিত্ব প্রদান করা হয়। সাবেক অফিসার ইনচার্জ এম.আই-১৭ ফ্লাইট (মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টারসহ)।
ছেলে-৬: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম বিদ্যুৎ, প্রধান উপদেষ্টা, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর একাদশ, সরিষাবাড়ী,
সাংগঠনিক সম্পাদক, সরিষাবাড়ী স্পোর্টস এসোসিয়েশন, সভাপতি, বড়বাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা ম্যানেজিং
কমিটি, দীর্ঘকালীন উপদেষ্টা, প্রথম আলো বন্ধুসভা, সরিষাবাড়ী, সাবেক আহবায়ক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,
সরিষাবাড়ী উপজেলা শাখা, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, সরিষাবাড়ী
উপজেলা শাখা, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সরিষাবাড়ী পৌর শাখা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ৭০’র এমএনএ ও ৭৩’র সাবেক এমপি, দীর্ঘ ৪৮ বছরের সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সফল সভাপতি, বিশিষ্ট রাজনৈতিক বটবৃক্ষ ও সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল মালেক এর কনিষ্ঠ পুত্র মেধাবী, সৎ এবং পরিচ্ছন্ন সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম বিদ্যুৎ এই স্মৃতিচারণ করেন। তিনি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠা বাবার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে, পিতার মতো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনার আনুগত্য ও বিশ^স্ত কর্মী হিসেবে সরিষাবাড়ী পৌরবাসীর জন্য কাজ করে যেতে চান।

স্বৈরাচারমুক্ত আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ও বিরোধীদলীয় রাজনীতির সময় জাতীয় নেতা মির্জা আজম ও জামালপুরের অভিভাবক ফারুক আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে সরিষাবাড়ী ছাত্রলীগের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তোলে বাবার মতো সরিষাবাড়ীর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে জামাত ও বিএনপির নির্যাতন থেকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে দল গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কঠোর পরিশ্রম, দুঃসময়ে কর্মীদের পাশে থেকে সারা সরিষাবাড়ী ছাত্রলীগের কর্মীদের এককেন্দ্র বৃত্ততে এনে জামাত-বিএনপি সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা হামলা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে সরিষাবাড়ীতে প্রতিরোধে গড়ে তোলতে সক্ষম হোন। ১/১১ সরকারের সময় জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির দাবীতে বাবার সাথে জনমত গঠনে বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন।

সেই সাথে কর্মী গড়ার কারিগর হিসেবে সবার নিকট ব্যাপক সমাদৃত এবং পরিচ্ছন্ন ভালো মনের মানুষ, এই সময়ের করোনা যোদ্ধা মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম বিদ্যুৎ বলেন, ‘মানুষ মরলেও কর্মের দ্বারা মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল মালেক সরিষাবাড়ীর সকল মানুষের হৃদয়ে চির জাগ্রত থাকবে। সকলেই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেন বেহেশতবাসী হোন।

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'