ডাক্তারের চিতায় বিচারকের আগুন

শেষ বিদায়ে বিচারক!

ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী জজ উমা দাস ঘর বেধেছিলেন ডাঃ দেবাশীষ দাসের সাথে। নিজে বিচারক হয়েই ইচ্ছা করে বিয়ে করেছিলেন একজন ডাক্তারকে। দুজনের প্রচন্ড ইচ্ছা ছিলো মানবসেবার কাজে নিয়োজিত থাকবে আজীবন। একদিকে জনগণকে ন্যায়বিচার, অন্যদিকে অসুখ-বিসুখের সেবা। ভালোই চলছিলো উমা দেবাশীষের সংসার, প্রশাসনিক ব্যাস্ততার সাথে সংসারের ব্যাস্ততা মিলেমিশে একাকার, এরমধ্যে বছর আড়াই আগে কোল জুড়ে এসেছিলো এক ফুটফুটে সন্তান। স্বপ্ন দেখেছিলো আগামীদিনের মানবসেবার জন্য উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুলবে সন্তানকে। কিন্তু হঠাৎ করেই উমা দাসের সংসারে হানা দিলো সর্বনাশা করোনা ভাইরাস।

উমাদেবী ঘূণাক্ষরেও চিন্তা করেনি এই ভাইরাসই তার ঘরে ভয়ংকর সর্বনাশ নিয়ে ঢুকেছে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিৎসায় থাকা অবস্থায় স্বামী দেবাশীষ দাস হার মানলেন করোনার কাছে। সর্বনাশের এই খবরটা পাবার পরেই উমাদেবী বুঝলো আজ সে একা, বড়ই একা, বিশেষ করে এই মুহুর্তে। ডানে বামে সামনে পিছনে কেউ নেই আজ। করোনা ছোয়ার আতঙ্কে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব অফিস সহকারী সবাই আজ দূরে, বহুদূরে। চেনা শহরটাকেই আজ খুব অচেনা মনে হচ্ছে উমাদেবীর। একদিকে বাড়িতে আড়াই বছরের সন্তান অন্যদিকে হাসপাতালে স্বামীর মৃতদেহ। হঠাৎ করেই মন বাধলেন উমাদেবী, পায়ের নীচে মাটি না থাকলেও পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। একা একা আয়োজন করলেন স্বামীর শেষ যাত্রার, বাড়ি থেকে নিজেই শিশু পুত্র সন্তানের হাত ছুইয়ে পাটকাঠী সাথে নিয়ে আসলেন শহরের শশ্মান ঘাটে।

হিন্দু শাস্ত্রমতে পুত্র সন্তানেরই যে অধিকার পিতার মুখাগ্নিতে। একাই নিরবে নিথরে নির্জন শশ্মানভুমিতে অপেক্ষা করলেন উমাদেবী, কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃতদেহের বহর আসলো শশ্মানে, যে কয়জন মৃতদেহ নিয়ে এসেছিলো তাদের সাহায্যেই স্বামীর সৎকারের কাজ শুরু করলেন। জানতে চাইলেন না শশ্মানবন্দীর শেষযাত্রার বন্ধুরা কোন ধর্মের! কোন জাতের? জানতে ইচ্ছাও হলো না তার। উমাদেবী ভালোভাবেই বুঝেছিলেন নিজেদের বিপদকে উপেক্ষা করে যারা মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে, তারাই প্রকৃত মানুষ, সব ধর্মের উপরেই তাদের অবস্থান।

পুত্রসন্তানের হাতের ছোয়া কাঠিতে আগুন লাগিয়ে মুখাগ্নি করলেন স্বামীর। ঘন্টা তিনেক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন উমাদেবী দাউদাউ করে জ্বলা জলন্ত শশ্মানের দিকে তাকিয়ে। সদ্যমৃত প্রিয় স্বামীর দেহ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, সাথে সাথে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে উমাদেবীর স্বপ্ন সাধ ভবিষ্যৎ! একাই এসেছিলেন উমাদেবী শশ্মানভুমিতে, চিতার আগুনে স্বামীর দেহ বিলীন করে একাই রওনা দিলেন বাড়ির পথে। পথ চেয়ে বসে আছে তার আড়াই বছরের সন্তান। মা সন্তানে জড়াজড়ি করে বসে থেকে কিছুটা হলেও খুজে পাবে স্বামীর স্পর্শ, অবুঝ সন্তান পাবে বাবার পরশ। মানসিক ভাবে সুস্থ হয়ে উঠুক উমাদেবী, কঠিন কঠোর দুনিয়ায় সাথে নিজেকে আত্মস্ত করে নিক ধীরে ধীরে। বুকের ধন সন্তানকে মানুষ করুক নিজের মতো করে, এই অসহায় পৃথিবীর উপযুক্ত মানুষ করে তৈরি করুক তার একমাত্র স্বজনকে। মা সন্তান ভালো থাকুক এই আর্শীবাদ রাখি আজ সবাই।

(এস.এ রুহুল আমিনের টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত)

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'