সুন্দরবন আমাদের ঐতিহ্যের ধারক বাহক

লেখা ও ছবিঃ সংগৃহীত

আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাচীন সৌন্দর্যের প্রতীক। দেশের সম্পদ। ঐতিহ্যের ধারক বাহক। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভের মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম। এই দৃষ্টিনন্দন বনে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলোরব সার্বক্ষণিক শোনা যায়। পাখির কিচিরমিচির গানে হৃদয় প্রাণ মুগ্ধ করে তুলে। শুধুমাত্র পাখ পাখিই নয়, রয়েছে অনেক বন্যপ্রাণী। এসব বন্যপ্রাণীর মধ্যে সিংহ, বাঘ, হাতি বালুক, বানর, শিয়ালসহ রয়েছে অগণিত চার পা বিশিষ্ট প্রাণী। রয়েছে অসংখ্য বিষধর সাপ। শুধু তাই নয়, বিশাল আয়তনের অধিকারী সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতিক সম্পদ। যা মহান আল্লাহর খাস রহমত। সুন্দরবনের মাঝে রয়েছে ছোট বড় প্রায় পাঁচ হাজার নদী। নয়নাবিরাম সুন্দরবন ও বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য। তাই বলতে চাই, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য এদেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের দেশ, একটি স্বাধীন দেশ। এ দেশে ইউপি মেম্বার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্য, নির্বাচনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভোটে একজন সদস্য নিবাচিত হয়ে থাকেন। তারপর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশ, জাতির ও সরকারের যাবতীয় সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। শুধুমাত্র নির্বাচিত সদস্যরা না, এটা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমার আলোচনায় বলতে চাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে সুন্দরবন। তাও দৃষ্টিনন্দন সুন্দরবনটি আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত। ঐতিহ্যবাহী, সৌন্দর্যের প্রতীক, রূপের জাদুকর সুন্দরবন আজ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংস হতে যাচ্ছে। যারা ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত হবে ধ্বংসকারীর বিরুদ্ধে সগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং বিচার করতে হবে। কেননা গবেষকরা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। অথচ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ উপেক্ষা করে নৌ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে স্থায়ী নৌরুট চালু করেছে।’ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌরুট চালু থাকায় মালামাল পরিবহনে সক্ষম নয়, এমন পরিবহন চলাচল করছে। অপরিপক্ব নৌযান দ্বারা ফার্নেস ওয়েল পরিবহনের সাথে দুর্ঘটনা ঘটেছে। যেই পরিবহনে সাড়ে তিন লাখ টন ফার্নেস ওয়েল তেল ছিল। দুর্ঘটনার পর সেই তেল সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে প্রায় ১৪০ কি.মি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
সুন্দরবন এলাকার রামমঙ্গল নদীপথ দিয়ে পড়শি রাষ্ট্র ভারতের জাহাজগুলো প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বজবুজা নদী হয়ে অঙ্গতিহারা চেকপোস্ট দিয়ে এসব জাহাজ মংলাবন্দরের দিকে যাচ্ছে। জানা যায়, বজবুজা নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ভারতের ১৫টি জাহাজ চলাচল করে। নৌপথে যানবাহন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণ হচ্ছে। শব্দ দূষণ প্রতিটি প্রাণীর জন্য মারাত্মক ব্যাধি। এ ধরনের শব্দ দূষণের কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা বনের গভীরে আশ্রয় নিচ্ছে। তত্ত্বাবধানের অভাবে নৌপথে চলাচলকারী বাহনগুলো প্রতিনিয়ত নদীতে বর্জ্য ত্যাগ করছে। এসব বর্জ্য তখন তৈরি করে নদী দূষণ। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবনের সুন্দর পরিবেশ। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের বাঁচার পরিবেশ। সারাদেশে বড়ই অভাব বন জঙ্গলের। বন্যপ্রাণী বসবাসের জন্য আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। নানা ধরনের বন্যপ্রাণী সুন্দরবনে থাকার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। আগে সুন্দরবনের আশপাশে বাঘ, হরিন, সিংহ,ভাল্লুকসহ হরেক রকম বন্যপ্রাণী দেখা যেতো, এখন আর সেসব দৃশ্য চোখে পড়ে না। সুন্দরবনের সুন্দর পরিবেশ হারাতে বসেছে। তাই সুন্দরবনের হারানো স্মৃতি, সুন্দর পরিবেশ ফিরে আনতে হবে। আমাদের প্রাচীন এতিহ্যবাহী সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করতে হবে।
সুন্দরবন সংরক্ষণের জন্য পরিবেশ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তি, সমাজ, দেশ এবং জাতির স্বার্থে সুন্দরবন রক্ষার পরিবেশ তৈরি করে ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেয়া সম্ভব না। তাই শ্যালা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী সব উন্নয়ন প্রকল্প স্থানান্তর করতে হবে। সুন্দরবনের মাঝে নৌরুট বন্ধ ঘোষণা করতে হবে। সুন্দরবন ধ্বংসের জন্য যারা রাষ্ট্র ক্ষমতাকে অবৈধ্যভাবে ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করার জন্য জোরালো আইন তৈরি করতে হবে।
রামমঙ্গল, অঙ্গতিহারা, বুজবুজা নৌপথ দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কার্গো চলাচল বন্ধ করার আইন তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ বিরাট হুমকির মুখে। এসব নৌপথ দিয়ে অব্যাহত বর্জ্য নিক্ষেপ ও বিকট সাইরেনের কারণে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যা সুন্দরবনের পরিবেশকে নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত সুন্দরবন ধ্বংস হচ্ছে। আমাদের মাঝে কিছু খারাপ শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা প্রতিদিন সুন্দরবনের গাছ ও ডাল কাটে, মাটি খনন করে নিয়ে আসে। গাছ কেটে ও মাটি খনন করে পরিবেশ নষ্ট করছে। বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে দেখা যায়, প্রতিদিন সুন্দরবনের আয়তন বা সীমানা কমে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ। অথচ আমরা মানুষ সার্বক্ষণিকভাবে সবুজ গাছপালা থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে থাকি। সে হিসেবে গাছ আমাদের উপকারী বন্ধু। তাই প্রতিদিন, প্রতিমাসে নতুন করে গাছ লাগানোর দরকার। আমরা গাছ কেটে বিক্রি করি। গাছের ডাল কেটে ফেলি। কিন্তু গাছ লাগাই না। এসব অপকর্মের মাধ্যমে প্রতিক্ষণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা পরিবেশ রক্ষার কোনো প্রচেষ্টা করি না। আমাদের মাঝে আরো একশ্রেণীর খারাপ মানুষ আছে। যারা প্রতিদিন বিনা কারণে বন্যপ্রাণী শিকার করে যাচ্ছে। অথচ জীব হত্যা মহাপাপ। আমরা সে কথা মনে করি না।
আমাদের দেশের পরিবেশবিদরা বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই কোলকাতার হেমনগর বন্দর, মংলা সমুদ্রবন্দরে মালবোঝাই জাহাজ চলাচল করছে। যার কারণে ১৪০ কি.মি লম্বা সুন্দরবনের নৌপথে তার যথেষ্ট প্রভাব পড়ছে। ভারী মিশিনের যান চলাচল ও তাদের বিকট সাইরেনে সুন্দরবনের পরিবেশ ক্ষতিসাধন হচ্ছে।’ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সুন্দরবনের পরিবেশ নষ্টের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হাওর অঞ্চলবাসীরা বলেছেন, ‘সরকার পক্ষ নিশ্চপ কেন? দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি খুঁজে পাচ্ছে না। তারা বিভিন্ন রকম বৈঠক করে নৌপথ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং জনসম্পদ ধ্বংসের পাঁয়তারা করছেন।’ এ দেশের গবেষকরা আরো বলেছেন, ‘সুদীর্ঘ ১৪০ কিলোমিটারের এ নৌপথ দিয়ে নিয়মিত যান চলাচল করার কারণে গত ৯ ডিসেম্বরে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যদি আরো ঘটে, তাহলে সুন্দরবনের পরিবেশ তাড়াতাড়ি বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
শ্যালা নদীর মৃগমারী জায়গায় মালবাহী জাহাজের ধাক্কায়, তেলবাহী ট্যাংকারের তলা ফেটে ‘এমডি ওটি সাউদান স্টার সেভেন’ নামের তেলবাহী ট্রাংকার ভোররাতে পানিতে ডুবে যায়। সেই ট্রাংকারে তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৮ লিটার তেল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। যা সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের জন্য বড় কারণ হয়ে দাঁড়িযেছে। গাছের কচি ডগায় তেলে আবরণ পড়েছে। তেলের ট্যাংকার নদীতে ডুবে যাওয়ায় পৃথিবীর একক বৃহৎতম ম্যালগ্রোভ সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য চরম অস্তিত সংকটে পড়ছে। তাই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়েছে।

"স্বাধীনতার মহান স্থপতির এক (০১) আদর্শের" তত্ত্বীয় গবেষণাগার কর্তৃক সত্য প্রকাশে বিশ্বস্ত একটি অনলাইন পোর্টাল 'দৈনিক তরঙ্গ বার্তা'